এখন সময় ভাঙ্গনের



জীবন যতই দীর্ঘ্য হচ্ছে, হারানোর তালিকাটাও তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। লুকোচুরি খেলে যাচ্ছি নিজের সাথে নিজেই। যারা সস্তায় ঘুম কিনতো, বারবার হারিয়ে ফেলি তাদের ঠিকানা। আমার মনে পড়ে যায় বনলতা সেনের কথা।
চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নেশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য্য, অতিদুর সমুদ্রের প'র
হাল ভেঙ্গে যে নাবিক হারিয়েছে দিশা,
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনী দ্বীপের ভিতর
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে, বলেছে সে ' এতদিন কোথায় ছিলেন?'
পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।
নাহ, আমার কোনোদিন নাটোর যাওয়া হয়নি। দেখা হয়নি পাখির নীড়ের মত বনলতা সেনের চোখ। শুধু হেমন্তের কুয়াশা হেঁটে গেছে আমার উঠোন দিয়ে। সেই কুয়াশা ঝুলে থাকত করমচার গাছে, লেবুবনে, নারকেল গাছের ডগায় আর পুকুরের জলে। আমার জীবনের প্রথম ভুতের সঙ্গে এই পুকুরের পাড়েই সাক্ষাত। কিন্তু, সেই মেমসাহেবের সঙ্গে আমার চোখাচোখি হয়নি কখনও। দিনের পর দিন নিশুতি রাতে আমার এবং শুধু আমারই ঘুম ভাঙ্গিয়ে চলে এসেছে সে। কোন বার্তা সে বহন করে আনতো আজও জানা হয়নি। জীবনের কন্ডাক্টর বারবার কেবলই চেঁচিয়ে বলে যায় ' পেছনের দিকে বড্ড এগিয়ে গেছেন স্যার। '

সত্যি কথা। আমি যতই ওড়ার চেষ্টা করি,রোজ রাত্রে খাটের তলা থেকে কিছু যান্ত্রিক তার বেরিয়ে আমায় ঠিক চেপে ধরে, আষ্টে পৃষ্টে গিঁট মেরে ফেলে দেয় বিছানায়।আমি গল্প লিখব,কবিতা লিখব...তারপর তাদের ছিঁড়ে,নষ্ট করে ফেলে দেব-এই অবধি আমি বাউল।কিন্তু যখনই সেগুলো সবাইকে বলে পাগল সাজব,আমার একতারা আমাকে থাপ্পড় মেরে বসিয়ে দেয়।

আসল গেরুয়া সেই নৌকোটা ছিল।ডুবন্ত সুর্যের আলোয় চ্যাটচ্যাটে ভেজা একটা নৌকা।সে পারে নোম্যানস ল্যান্ডে যেতে,আমি না। আমি নৌকা নই,আর সে জন্যেই আমার গল্পেরা কোনোদিন শেকড় বাকড়ের গিঁট থেকে বেরোতে পারবে না। দু টাকা দিয়ে শুধু যাতায়াত বেচা শিখেছি,এঘাট থেকে ওঘাট।সে তো ঘাটকাজ,গল্প বেচতে শিখলাম কোথায়?

আমার গল্পেরা তাই আমার মতই অপদার্থ। আর এভাবেই,তাই,আমার গল্পের সাহিত্যমুল্য একদিন শুন্য হতে হতে সংসারী হয়ে যাবে,আমি জানি।
হায় চিল, সোনালী ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর কেঁদোনাকো উড়ে উড়ে ধানসিঁড়ি নদীটির পাশে।
তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মত তার ম্লান চোখ মনে আসে।
পৃথিবীর রাঙ্গা রাজকন্যাদের মত সে যে চলে গেছে রূপ নিয়ে দূরে,
আবার তাহারে ডেকে কেন আনো?
কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে?
হায় চিল, সোনালী ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর কেঁদোনাকো উড়ে উড়ে ধানসিঁড়ি নদীটির পাশে।

নারায়ণের ঘাটে গিয়েছি কতদিন, তবু আজও মনে হয়, আমি কি দেখেছি তোমায় মাঝি, হে নারায়ণ, দেখেছি কি কোনো জন্মে, তিতাস পাড়ে? কত কৈশোরসন্ধে ও কুমারী সদৃশ ভোর, গোধূলী বিকেল আর ঘরেফেরা পাখিসন্ধ্যায় আমি হেঁটেছি, হেঁটে হেঁটে চলে গেছি তিতাস হিজলছায়া মেখে...আর অনেক অনেক রাতে সৌরজ্যোৎস্না মেখেছি তিতাস হাওয়ায় আর গভীর গভীর শুনেছি দূরগামী দাঁড়িদের নিশি-জাগার শব্দ, পাখিডানার গান... তবু, আজ, এই নির্ঘুম, শাহরিক রাতে মনে হয়, তিতাস
দেখিনি; আমি কোনোদিন দেখিনি তিতাসছায়া, সেই নারায়ণ মাঝিকে; কখনো দেখিনি আমি এই জন্মে, দেখেছি কেবল নদীর শব আর রক্ত আর ধূলিদীর্ণ এক নারায়ণ-মুখ।
পেঁচার ধূসর পাখা উড়ে যায় নক্ষত্রের পানে;
জলা, মাঠ ছেড়ে দিয়ে চাঁদের আহ্বানে
বুনো হাঁস পাখা মেলে, ডানার শব্দ শুনি তার।
এক দুই তিন চার অজস্র ওপার...
রাত্রির কিনারা ঘেঁষে তাহাদের ক্ষিপ্র ডানা ঝাড়া...

অতঃপর আমরা আসি আলোকসজ্জামুখর এক শহরে ।এখানে অনুভব আছে ,গীতিকাব্যের কথন আছে ,শূন্যতা আছে । আর একটি নদী আছে । নামটিও জানা আছে ।নীরবধি প্রবাহ প্রতিশ্রুত নদীর স্রোত ধরে বেড়ে ওঠে জলের অনুভব । বেড়ে ওঠে শত জলবিন্দুর আবেগ শহরের ওপাশে । আর এপাশে আকুলতাসিক্ত হৃদয় । এখনই নদীর কাছে যেতে চায় । কখনো কখনো নদী নিসঙ্গতার কথা বলে। যখন জলের গান অন্য কোন প্রবাহের কার্নিভ্যালে যায় । কখনো কখনো নদী পূর্ণতায় অগ্রসর, এক বর্ষাবিকেলে।

আমি আমার নদীটির নাম দিই ময়ুরাক্ষী। আমার শৈশবের ময়ুরাক্ষী। নিরন্তর নিরবধি বয়ে চলা ময়ুরাক্ষী।
পান্ডুলিপি কাছে রেখে ধূসর দীপের কাছে আমি
নিস্তব্ধ ছিলাম ব'সে;
শিশির পড়িতেছিলো ধীরে-ধীরে খ'সে;
নিমের শাখার থেকে একাকীতম কে পাখি নামি
উড়ে গেলো কুয়াশায়, — কুয়াশার থেকে দূর-কুয়াশায় আরো।
তাহারি পাখার হাওয়া প্রদীপ নিভায়ে গেলো বুঝি?
অন্ধকার হাৎড়ায়ে ধীরে-ধীরে দেশলাই খুঁজি;
যখন জ্বালিব আলো কার মুখ দেখা যাবে বলিতে কি পারো?
কার মুখ? —আমলকী শাখার পিছনে
শিঙের মত বাঁকা নীল চাঁদ একদিন দেখেছিলো তাহা;
এ-ধূসর পান্ডুলিপি একদিন দেখেছিলো, আহা,
সে-মুখ ধূসরতম আজ এই পৃথিবীর মনে।
তবু এই পৃথিবীর সব আলো একদিন নিভে গেলে পরে,
পৃথিবীর সব গল্প একদিন ফুরাবে যখন,
মানুষ র'বে না আর, র'বে শুধু মানুষের স্বপ্ন তখনঃ
সেই মুখ আর আমি র'বো সেই স্বপ্নের ভিতরে।

আমাদেরই এই প্রিয় শহরে ঘুম ভাঙ্গা কোন পথের বাঁকে ফেলে আসা চিরচেনা গল্পগুলো শুধুই আমাদের...শেষ বিকেলের সূর্যটাকে তোর আঁচলে বাজি রেখে আমি হয়ে যাই বেখেয়ালি...সূর্যের বৃত্তায়ন মেনে চলে যায় অগ্রহায়ণ, ঐতিহ্যের খেয়ায় শেষাবধি খেয়ালী পিঠাপুলি পৌষ। কোনো "কাকবলী" অন্নপ্রসন্নতা নেই, নেই ধুমধাম এবাড়ি -ওবাড়ি হৈ -রব; গোলাশূন্য বাড়িতে বৈরাগের বিষণ্ণ পুরুষ শাসন করে চলেছে এক শাহাজাদা দুর্লভ, মহামান্য গরীব রাজাধিরাজ! যার পরম্পরা তপস্যায় হাড়-জিরজিরে কৃষকের নিসঙ্গ বাথান দাহকালের পোস্টার সেঁটে দিচ্ছে সর্বহারার মত মাটির দেয়ালে । কোত্থেকে এক লোহা লক্কর নাগীন এসে ফসলীর শিথান গিলে নিয়ে বলছে, আরও দাও! আরও দাও! নেই হে কালীয়নাগ! কৃষ্ণের একেক ফালি আজও জমা রাখা আছে আমাদের কারও কারও বুকের শিবালয়ে । দেখে যাও, এসো, উঠোনে ধান এসেছিল নতুন, একাদশী চাঁদের ছাতায় আজ নবান্ন নেমে এলো আমার আঙিনায় বাঁশপাতা জোছোনায়।
এই সব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে;
বাইরে হয়তো শিশির ঝরছে, কিংবা পাতা,
কিংবা প্যাঁচার গান; সেও শিশিরের মতো, হলুদ পাতার মতো।
শহর ও গ্রামের দূর মোহনায় সিংহের হুঙ্কার শোনা যাচ্ছে -
সার্কাসের ব্যথিত সিংহের।
এদিকে কোকিল ডাকছে - পউষের মধ্য রাতে;
কোনো-একদিন বসন্ত আসবে ব'লে?
কোনো-একদিন বসন্ত ছিলো, তারই পিপাসিত প্রচার?
তুমি স্থবির কোকিল নও? কত কোকিলকে স্থবির হ'য়ে যেতে দেখেছি,
তারা কিশোর নয়,
কিশোরী নয় আর;
কোকিলের গান ব্যবহৃত হ'য়ে গেছে।

অথচ এই ব্যস্ত নগরীতে চেনা মানুষের বড়ই অভাব। একি রাস্তায় একি সময় হেঁটে গেলেও কদাচিৎ পরিচিত মুখের সন্ধান মেলে, কখনো বা মেলেই না। গলি থেকে রাজপথ, হসপিটাল থেকে অফিসপাড়া,  ব্যাংক থেকে সিনেমা হল কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়না একটি পরিচিত নির্ভরতার মুখ।

পাশের বাসায় বাচ্চার কান্নার আওয়াজে বুঝতে পারি নবজাতকের আগমন, অথচ শিশুটির নামটা পর্যন্ত জানা হয়না অনেক সময়। দূরের এপার্টমেন্ট এর গ্রীলে মাথা রাখা তরুনীটির গালে শুকিয়ে যাওয়া কান্নার দাগ হয়ত আমরা দেখতে পাই, কিন্তু জানতে পারিনা তার যন্ত্রনায় দগ্ধ হওয়ার কারন, জানতে চাই না বলেই। গভীর রাতে ল্যাম্পপোস্ট এর পাশ দিয়ে মাথা নিচু করে হেঁটে আসা ক্লান্ত যুবকটির হতাশার অতল খুঁজতে যাই না আমরা। গায়ে গায়ে ধাক্কা লাগা মানুষটার চেহারা না দেখে কেবল দুই অক্ষরের “সরি” শব্দ টা বলেই আমরা আমাদের দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেতে চাই। আজ আর কারো আনন্দ আমাদের উদ্বেলিত করে না, কারো  কষ্টে আমরা এখন আর খুব একটা ব্যথিত হই না। এই শহরে আমরা কেউ কারো নই, কারো জন্য কারো প্রাণ কাঁদে না, মন ছটফট করেনা।
আমি জানি, এসব বলার মত এখনও ছোঁয়নি এসে শীত
ঝরেছে যে সব পাতা এখনও তাদের রঙ ধূসরের চিহ্নরহিত
শিকড়ে বাড়িয়ে হাত তারা শুধু জল চেয়েছিল
এখন অনেক দেরী হয়ে গেছে, এক তিলও
অবসর নেই আর তোর বা আমার – কী করে মেলবো ডানা দখিনা হাওয়ায়
তবু যদি সময়ের থেকে কিছু দূরে গিয়ে আজ একবার বসে থাকা যায়.
.

সেই সব দিনে আমাদের যারা জড়িয়ে থাকত তারা অনেকেই পুরানো হয়ে গেছে এত ক্ষণে – এমনি সেই বটগাছটাও, যার নিচে ছিল আমাদের গ্রামের শ্মশান। অফুরন্ত সময় হাতে নিয়ে থাকা আমরাও দেরী করে ফেলি – কিছু কথা বলা হয়েছিল – অনেক কথা বলি নি সময় মত। আজ বিশ বছরেও বলা হয় নি ঝন্টুকে যে ক্রিকেট টুর্ণামেন্টের সাড়ে পাঁচ টাকার হিসাবের গড়মিলের মতানৈক্য বয়ে নিয়ে কথা না বলে থাকার কোন মানে হয় না। আজ আর অবসর নেই, বিশেষত আমারই, আমি সময়ের থেকে কিছু দূরে গিয়ে বসতে চাই – ভাবতে চাই যে শীতের সাথে সাথে ঝড়ে গেছে ক্ষণিকের গড়মিল, অবুঝতা – না ঝরা পাতা গুলিই নিয়ে না হয় আজ বসে থাকি – তুমি, আমি – আমরা!

ছোট বেলায় আত্মহত্যার ছাপ আমাদের মনে ঢুকিয়ে দিল রায়েদের গুলু – একদিন দুপুর বেলা মাঠ থেকে সে আর ফিরে এল না। ষষ্ঠী ডাঙার মাঠের একমাত্র শ্যাওড়া গাছের তলায় গুলুদাকে কে যেন পড়ে পড়ে গোঙাতে দ্যাখে – গুলুর হাতের আঙুল গুলি শ্যাওড়া গাছের শিকড় জড়িয়ে ধরেছিল – ফেনা ভরা মুখ জল চেয়ে চেয়ে হয়ত ক্লান্ত। সেই গাছের তলা থেকে রায়দের বাড়ি মাত্র কয়েকশো মিটার দূরে। দেরী হয়ে গিয়েছিল – আমাদের স্মৃতি বলতে মনে আছে মাটির দুয়ারে গুলুর শরীরে খিঁচুনী আর তার পর সব শান্ত। বৈদ্যডাঙা স্কুল থেকে গুলুর বোন মানা কে ডেকে নিয়ে এল কেউ – মানা তখন সবে প্রস্ফুটিত হচ্ছে নীল পাড় শাড়িতে। তার পর সব শেষ - গুলুর কোন প্রেম ঘটিত ব্যাপার ছিল না – মায়ের সাথে রাগারাগি করে গুলুর আর ফিরল না। জানি না তার পর রায় গিন্নিকে পাড়ার মহিলা মহল পাষাণ বলত কিনা – গরাঙ্গেতে গুলু মিলিয়ে গেল এমন করেই। তখনো আমাদের ওদিকে ধান গাছে দেওয়ার বিষ এন্ড্রোসিল আসে নি – প্রায় নিয়মিত ব্যবহার হওয়া এনডিন্‌ খেয়েই গুলু চলে গেল। যে গ্রামে তখন এন্ড্রোসিল চালু হয়ে গিয়েছিল, তারা গুলুর মরে যাবার খবর শুনে বলল, তোরা এনডিন্‌ খাওয়া পাবলিকও বাঁচাতে পারলি না! তাহলে যদি পাবলিক এন্ড্রোসিল খায় তা হলে কি করবি রে! এই বলে এন্ড্রোসিল খেলে পরে তার থেকে বাঁচানোর রিকভারী স্টেপ গুলো বর্ণিত হত।
আসলে যে ছেলেটা মরে গিয়েছিলো কিছুদিন আগে
জবানবন্দী তার হয় নাই লেখা;
বিশ্বাস করেছে সেও দখিনা হাওয়ায়,
মেনে নিয়েছিলো, এভাবেও বেঁচে থাকা যায়
প্রতি দিন, অষ্ট প্রহর
এবং রাতের শেষে ভোর, প্রতি দিন নিয়মিত আসে
অটুট বিশ্বাস ছিলো তার – দখিনা বাতাসে;
তবুও সে মরেছিলো
মরেছিলো, মরে যেতে হয়
মরে যাওয়া, অর্থাৎ জীবনের অপচয় করেছিলো
সুতরাং হিসেবী ছিলো না বলা চলে
তলে তলে কী যে ভেবেছিলো সে খবর নেওয়া যায় যদি...


আমাদের এই নিউরোন ধরে রেখেছে অনেক অনেক গল্প, যে গল্পের কোন মানে নেই। মাথার কাছে নিয়ে ঘুমনোর মতো মানুষের মুখ হারিয়ে যায়, জীবন নামক প্রেমিকার কাছে বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়ে একএকদিন খুব মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরে শুয়ে পড়ি পৃথিবীর খাটের তলায়। আকাশগঙ্গা দেখা করতে আসে, দেখা করতে আসেন আনুবিস।
আমার মাথার মধ্যে তখন ক্রমাগত বেজে চলে মাইলস ডেভিস, লুইস আর্মস্ট্রং, বিলি হলিডে, ন্যাট কোল কিং। চোখ থেকে শব্দ ঝড়ে পড়ে, খুব ভয় করে, হাতড়ে পাই না বামদিকের বাবাকে, ডানদিকের মা কে। জীবনকে আজকাল খুব ভয় হয়, স্বপ্নটাও আচমকা ধর্ষক হয়ে যায় বা ধর্ষিত। খুব ভয় হয় জীবন থেকে বেশি যদি কিছু চেয়ে ফেলি। যদি অধিকারের বেশি কিছু চেয়ে ফেলি আচমকা?  যদি চেয়ে ফেলি আমাদের বাড়ির উঠানের পেয়ারা গাছের গল্প  – রাস্তাপারের রামচন্দ্রের দিয়ে যাওয়া নতুন খেজুর রসের গল্প – আর সেই গুড়ের সাথে মিশে থাকা কিছু নরম কানের লতির স্মৃতি -
আমাদের নিরালা উঠোনে ঝাঁকড়াচুলের একটাই গাছ
পাগলের মত নির্বাক হিংসে করবে শুধু - কথা ছিল
নতুন গুড়ের ঘ্রাণ ঠোঁট ছুয়ে মিশে যাবে কানের লতিতে
সূর্যাস্তের আগে দীর্ঘ গোধূলি জুড়ে আমাদেরই ছায়া
ক্রমশঃ আবছা হবে আমাদেরই নিভৃত সড়কে।

কারো থেকেই আমার হয়ত আর কিছু চাওয়ার নেই। পেছন থেকে যাদের ছুরি মারা হয় তারা সকলেই বেঁচে থাকে শুধু তাদের আর কিছু চাওয়া হয়ে ওঠে না কারোর থেকে কখনো বিশ্বাস, শুধু শব্দটুকু নয়।প্রতিদিন বিশ্বাস তার পুরনো দালানবাড়ির মতো গন্ধ নিয়ে ঠোঁটের উপর মোলায়েম আঙুল ধরে বলে- ‘লেখো’।

একটা বয়সের পর মানুষের সবথেকে বড় বন্ধু হয়ে ওঠে স্মৃতি এবং বিস্মৃতি।স্মৃতির পথ ধরেই আসে বিস্মৃতি।আবার বিস্মৃত দিনের কথা হাতড়াতে হাতড়াতে আসে স্মৃতির পাহাড়।তবে বর্তমান জীবনে দিনগুলো এতো দ্রুত বদলে যায় যে স্মৃতি এবং বিস্মৃতি একেবারে ভারসাম্য রাখতে পারে না।এই আমি যখন আমার জীবনের চার পাঁচ বছর আগেকার কথা ভাবি তখন দেখি কি ভয়ানক বদলে গেছে জীবনটা।শুধু আমার জীবন নয়।এতো দ্রুত একটা সময়ের মধ্যে আমরা চলছি যে বদলে যাচ্ছে আশেপাশের সবকিছু।আশেপাশের সবকিছু বদলে গেলে নিজেকেও নিজের থেকে একটু অচেনা লাগে বইকি।হটাত করে খুব দামী একটা জীবনের মাঝে দাঁড়িয়ে আমিও চার্লি চ্যাপলিনের ‘গোল্ড রাশ’ সিনেমার মতো রাস্তা থেকে ফেলে দেওয়া একটা সিগারেট তুলে নিই।
কোনদিন দেখা হয়ে যাবে
যেমন মেলার ভিড়ে চোখে পড়ে যায় চেনা মুখ, সেইভাবে
ভদ্রতার হাসি, অমায়িক
হয়তো বা মুখোমুখি নয়, বেশ দূরে, তবু ঠিক
পাশাপাশি বসা যেন, কিছু কথা বড় আলগোছে
সময় কত কি মোছে
খাড়াই অন্ধকারে নিষ্প্রভ পাহাড়ের দাগ
খুনসুটি, ভালোবাসা, আদর – সোহাগ
নদীতে জোয়ার ছিলো, এখন ভাঙ্গন।

বিঃদ্রঃ কিছু কিছু কবিতার লাইন জীবনানন্দ দাশের আর বাকিটা আজগুবি কল্পনা কিংবা সত্যি মনে করলে এটাই হয়তো জীবন। 

0 comments:

Post a Comment