এক হলুদ পাতার গল্প



কে যেন বাইরে থেকে ডাক দেয়
জ্যোৎস্নার মত শাড়ি, সরু পাড়।
ফেলে আসা শৈশবের রোদ,
ইস্কুলবেলার ধুলো
আঁচলে সাজানো আছে থরে থরে।

সুন্দর মলাটের হলুদ পাতাওয়ালা ডায়েরী নেই আমার। নেই নীল কালির বলপেন। আমার স্মৃতির ছবি নেই...আমার শূণ্য এক দীঘির পাড় আছে। আছে শিরীষের ছায়া,একলা এক পদ্ম। আর চারিপাশের আধ লম্বা ঘাস। তাদের পাশে চলে যাই...সব দুঃস্বপ্ন তো আর আড়ালে থাকে না। সেদিন শহুরে এক ভর দুপুর....বলেছিলাম অনেক আগে, হয়ত অভিমান কিংবা অনুরাগে। ভুলে যেতে চাই- সেই শেষ বিকেলের একাংশ কিংবা পুরোটাই। যে বিকেলে তোমার জন্য চিলের ডানায় বেঁধেছিলাম রোদ,
দুরন্ত এই হৃদয়্টাও হয়েছিল সুবোধ। যে সাঁঝের বেলা ভেঙে জোনাকি পোকা এনেছিলাম তোমার জন্য
তোমার জন্য যে বিকেলে হয়েছিলাম সুনীল। দশ-দিগন্ত খুঁজে এনেছিলাম চোদ্দটি গোলাপ নীল। কিন্তু বরুনারা কথা রাখেনা...

আমি মায়াবী হতে পারিনা
মায়াটা আমার ধরন নয়…
তবুও তোকে জড়াতে চাই।।

মাঝরাতে আমার বাগানের ছায়াগুলো বেঁকে ভেঙ্গে যাচ্ছিলো। জ্যোৎস্না তীব্র হয়েছে। ফুলের গন্ধ গাঢ়, মন্থর হয়েছে বাতাস। দুঃখীদের জন্য স্বপ্নের সন্ধানে বেরিয়েছেন ঈশ্বর, আনাচে-কানাচে ঘুরে তিনি চরাচর থেকে স্বপ্নদের ধরেন নিপুন জেলের মতন। আঁজলা ভরা সেই স্বপ্ন তিনি আবার ছড়িয়ে দেন। মাঝরাতে তারার গুঁড়োর মত সেই স্বপ্নেরা ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীতে; কই সেই স্বপ্নেরা আমার ঘরে আসেনাতো।
বহু বছর আগে হলুদ ফুলকে প্রথমবার আমি আমার যন্ত্রণার কথা বলি। প্রথমে মনে হয়েছিল কিছুটা হলেও অনুভবে ছিলাম আমি ; আসলে পরে বুঝেছিলাম ফুলেরা যন্ত্রণা বোঝেনা । তারপর পেরিয়ে গেছে শতাব্দী, রাজা থেকে সুলতান - সুলতান থেকে রাজা; তারপর বিদেশী  শাসকদের দাবানলে বার বার হারিয়েছি দেশ, সকাল হবার আগেই  লোটাকম্বল নিয়ে ছুটে গেছি ট্রেন ধরতে; প্রথমে অবশ্য ট্রেনছিল না, হাঁটা পথে পার করেছি ভূমি । জন্মভূমি স্বাদ কতদিন পেয়েছিলাম মনে নেই; মনে নেই প্রথম দেশের নাম; মনে নেই আমার প্রথম প্রেম । মনে নেই আমার দেখা প্রথম কাক তাড়ুয়ার কথা,
মনে নেই আমার শৈশব, মনে নেই রান্নাবাটির খেলাতে কে প্রথম আমাকে তার কুটুম ভেবেছিল ।
মনে নেই কবে প্রথমবার সাঁতরে পার হয়েছিলাম  নদীর মোহনা । এখন শুধু আকাশের তারা গুণে বাড়ি ফিরি । হায় জীবন! কেন তুমি বারবার ঘড়ির দিকে তাকাও!

সেই যে শতাব্দী আগে হলুদ ফুলকে বলেছিলাম আমার কিছু কিছু যন্ত্রণার  কথা; আমার কিছু গল্প, আমার কিছু চেনা কবিতা, আমার তাল গাছ, আমার রোদ্দুর , যা কিছু আমার ছিল শুধুই আমার ।

এক বসন্তের রাতে চুপি চুপি এসেছিল এক ঝাঁক পাখি, 
দিগন্তের অনেক দূর থেকে নানা রঙের সেই সব পাখি। 
কারো হলুদ পাখনার সাথে লাল ফিতের অবগাহন । 
ভীড় করে এসেছিল এক সাথে- যখন সন্ধ্যার বাতিগুলো জ্বলে উঠেছিল রাস্তার চারিদিকে, যখন 
তুমি পাটভাঙা ওড়নায় হেসেছিলে পূব দিকে চেয়ে,
যখন অফিসের লোকজন  ছুটেছিল বাসের পা-দানিতে ভর দিয়ে  বাড়ির ঠিকানায় ।
বাড়ির কার্ণিশে ভীড় করেছিল পাখিদের দল, 
কেউ কেউ দেখেছিল কেউ কেউ শুনেছিল এমন ঘটনা ।
কেউ কেউ করেছিল চিৎকার, 
কেউ কেউ লিখেছিল বিকেলের প্রেম। কেউ কেউ বলেছিল "আবার আসিবো ফিরে" । 
আবার কেউ কেউ মিথ্যে করে বলেছিল প্রেম ও পরিণয় । 
কেউ তো লিখেছিল "বিধবা যুবতী, দুখানি করুণ আঁখি মানে না যুকতি" ।
দিগন্তের অনেক দূর দেশ থেকে সূর নিয়ে পাখিরা ফিরেছিল সেদিন  বাড়ির কার্ণিশে ।

সেদিন তোর কথা বলেছিলাম চায়ের কাপে। কেউ কেউ বলেছিল তারা তোকে দেখেছিলো মিছিলে্‌...কেউ বলেছিল কথা হয়েছিল একবার,  এভাবেই রটেছিল সেই রাজকন্যার কথা, যার জন্যে কোন রাজপুত্র আসেনি ঘোড়ায় চেপে, এসেছিল কিছু পাথর ভাঙার দল ...
কিন্তু হায়! সবাই মালবিকা হতে পারেনা; সবার গালের আঁচিল উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়ায় না আকাশে বাতাসে...তাই আজও আমার দখিনের জানালায় উত্তুরে বাতাসেরা ডাক দিয়ে যায়...

এইবার এই শীত গেলে ফিরিয়ে দিও,
মান-অভিমান আর রাগ-অনুরাগ
গত বর্ষায় যা দিয়েছি সবটুকু তোমায়।

হয়ত
আমার একটা চিঠি ছিল না পড়া,
তাও রেখেছিলে ফেলে।
খামটুকু ও হয়ত খোলার সময়
হয়ে ওঠে নি কখনো।

হয়ত
বুকশেল্ফে একাকী একটা বই ছিল, না পড়া।

ফিরে আসার সময় জানতে পারিনি
পড়েছিলে কী না;
জেনেছিলে কী গল্প লেখা ছিলো তাতে?

হয়ত
বারান্দায় পড়ে থাকা কোন টবে
আমার ছুঁয়ে দেয়া কোন চারা গাছ
অযতনে কিছুদিন বেড়েছিল আনমনে।

কী ফুল হতো জানিনা তাতো
তুমিও জানোনি, 
তার আগেই যে শুকিয়েছে তার ডালপালা।

হয়ত
একটা কবিতা জন্মেছিলো
একাকী হয়ে থাকা চার দেয়ালে
কোন একদিন তুমি পড়বে বলে।

কুয়াশায় মগ্ন রাতে – ভিজেছে রাতভর
বাতাসে উড়ে যাওয়া সেই কবিতাও
পড়া হয়নি ।

এত কিছু হয়ত হয়ে, একদিন
পাতাঝরা শীত ফিরে গেলে 
যা-ই গত বর্ষায়
পাশাপাশি হেঁটে কুড়িয়েছি
দুজনে হাতে হাত রেখে।

গত বর্ষায় যতটা ভিজেছিল
আমাদের সর্বস্ব অশ্রুজলে – তার সবটুকু হয়ে
বর্ষার পরে শরৎ পেরিয়ে কিংবা
হেমন্তের খোলা আকাশে -
সেখানেই হয়তটা কিছু রেখেছিলে।

যদি পারো ফিরিয়ে দিও তাও-
শুদ্ধ ভালো বাসার ডাকটিকেট
লাগানো খামে মৌনতার দস্তাবেজ ভেবে।

আমি বুঝে নেবো ….
একদিন এখানেই তুমি ছিলে -
কোন এক আড্ডায় ;
গানের আসরে কিংবা
মিতবাক হয়ে থাকা জোছনায় -



0 comments:

Post a Comment