নন্দিনীকে শীতের কবিতাগুচ্ছ

ydi-mele-dhri-kthaa-dio-phurobaar-aagei-brsstti-debe

ব্যস্ততা নিয়ে রাস্তায় চলতে চলতে হুট করেই নাকে এসে লাগে খুব চেনা একটা গন্ধ!না, এই গন্ধ কোনো পারফিউমের নয় ! এই গন্ধ খুব কাছের কারো শরীরের গন্ধ!পায়ের ধাপ থেমে যায়!উৎসুক চোখ তন্নতন্ন করে খুঁজতে থাকে চারিপাশ টা!চলন্ত গাড়ি, ব্যস্ত মানুষ, টুংটাং রিকশার শব্দ সবকিছু এড়িয়ে চোখ দুটো খুঁজে ফিরে ওই গন্ধটার উৎস!খুঁজেও যখন ব্যর্থ হতে হয়, তখন রাস্তাভরা হাজারো লোকের মাঝে নিজেকে খুব একা লাগে!শূন্যতায় অনুভূতিতে ভেতরটা খা খা করে উঠে!চোখের কোণে টের পাওয়া যায় অশ্রুবিন্দু... তারা নিচে গড়িয়ে পড়ে না, চোখে থেকে ঝাপসা করে রাখে সামনের সবকিছু...দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলে আবার ব্যস্ত হয়ে পা বাড়াতে হয়...এই ব্যস্ত শহরে চেনা গন্ধের খোঁজ করা বোধহয় বড্ড বেমানান! বড্ড অনুচিত!

মন খারাপ করা বিষন্ন মেঘে ভরে ছিলো কাল আমার আকাশ। চোখের সমুদ্রের নোনা জলে ভেসে যাচ্ছিলো সব। অবহেলা করেছিলো কেউ! অবহেলার মত করুণ কিছু কে আছে? সন্ধ্যা নামছিলো যখন, চাঁদটা হাসছিলো আকাশে। আমি পাখি হয়ে যাই। কষ্টগুলোকে পাখির ডানায় সপে দিয়ে
উড়তে থাকলাম। জ্যোছনার আলোতে ভিজবো বলে। জ্যোছনা ছুঁলেই সব কষ্টরা বিলীন হবে।
আসলে স্পর্শ ব্যপারটাই এমন। আমার মনে পড়ে যায় এক আকাশের গল্প।  অন্য এক আকাশ। এই আকাশ পোড়ায় না। বারুদের মত জ্বলতে থাকা হৃদয়টাকে শান্ত করে দেয় । আকাশটাকে দু'হাতের
মধ্যে ধরে রেখেই আবারো দু"চোখে বর্ষা নামে। আর কি আর্শ্চয্য জ্যোছনার আকাশ থেকেও বৃষ্টি নামে অঝোরে; ভেসে যায় অবহেলার মত অনেক কিছু। 

একটা অসময়ের খুব দরকার, যখন চুল এলোমেলো করা হাওয়া সময়ের হিসেব রাখবেনা। পুরোনো আড্ডা সবই ভেঙ্গে গেছে। বাইরের পৃথিবীটা আর আগের মত নেই। বড্ড পর হয়ে গেছে সব। বেলা গড়িয়ে যায়। রৌদ্রতপ্ত ঘাসে নিবিড় গাছপালায় বনের গন্ধ ঘনিয়ে ওঠে। তাপ মরে আসে। ঘামে ভেজা শরীরে শীতের বাতাস এসে লাগে। বুঝতে পারি ফেরার সময় হল।

হারিয়ে যাব? হঠাৎ আমাকে ঘিরে নিস্তব্ধতা নেমে আসে। নিজেকেই প্রশ্ন করি, হারিয়ে যাব? 
নিশুতিরাতে এসেছিল এক ডাকপিয়ন। আমার সারাজীবনের সব স্মৃতি ফিরিয়ে দিয়ে গেছে সে। বোধহয় আমার আর কোনো চিঠি আসবে না। আমি যেন মোহানার কাছে পৌঁছানো এক নদী, যার স্রোতের আর কোনো ঢল নেই। সামনে মহা সমুদ্র।
আমি মুন্নির জন্য অপেক্ষা করি। কিন্তু আমার দিকে তার কোনো মনোযোগ নেই। আমি একটু হাসি, তারপর এগিয়ে যেতে থাকি। মুন্নি একা আসতে পারবে। আমি যখন থাকবোনা, তখনওতো মুন্নিকে একাই হাঁটতে হবে।



দিনগুলি কেটে যায়। কিন্তু কিভাবে যায় কেউ কি তা জানে? বুকের মাঝে উড়ন্ত প্রজাপতির মত একটুখানি সুখ বা ছোট্ট কাঁটার মত একটুখানি দুঃখ-এ তো থাকবেই। তবু দিন যায়। কথাগুলো থেকেই যায়।
অলক্ষ্যে হাওয়া বন্দুক নামিয়ে পরাজিত এক অচেনা পুরুষ ফিরে যায়। তার লক্ষ্যভেদ হয় না। কোনওদিন আবার সেই বন্দুকবাজ ফিরে আসবে। লক্ষ্যভেদ করার চেষ্টা করবে বারবার। হয়তো লক্ষ্যভেদ করবেও সে। ততদিন পর্যন্ত পৃথিবীর এই রঙ্গীন মেলায় আনন্দিত বাতাস বয়ে যাক এই কথা বলে-ঠিক আছে, সব ঠিক আছে। 

মেঘলা দিনের সকালে অকারনে মনখারাপ, কারন খোঁজার চেষ্টা করোনা, পাবেনা। মনে আছে সেই প্রথম ডায়েরী, বা হারিয়ে যাওয়া সেই রাস্তা, বা ফেলে আসা সেই মুহুর্ত? শুধু মনে কর একবার। দেখতে পাচ্ছ? অকারনের মনখারাপ  ফানুস হয়ে উড়ে যাচ্ছে ভীনদেশে। 

আমার বিশ্বাস, মানুষের জীবনে ইচ্ছাপুরনের ঘটনা এক-আধবার ঘটে। যেন তখন সমস্ত পৃথিবীকে উপেক্ষা করে ঈশ্বর অলক্ষ্যে তার কাছেই এসে দাঁড়ান। তখন মানুষের মনে যে পার্থনা থাকে তা পুরন করে দিয়ে চলে যান। সেই শুভক্ষনটাকে মানুষ অবশ্য চিনতে পারেনা। সে হয়ত তখন ভাবছে, ইস, কাল যে ছাতাটা অফিসে ফেলে এলাম তা কি আর ফিরে পাওয়া যাবে?

পাওয়া যায় এবং শেষ পর্যন্ত কেবল ছাতাটাই সে পায়।
ঈশ্বর আর কিছুই দিতে পারেন না, দেওয়ার অসীম ক্ষমতা থাকলেও।

আমি একটা মেয়েকে জানতাম, একবার চাইবাসায় নিরালা দুপুরে ঘুম থেকে উঠে একটা ঘুঘুর করুন ডাক শুনে তারমনে হয়েছিল, ইস, এখন যদি হেমন্তের সেই গানটা হত। ভাবতে ভাবতেই সে আনমনে ট্রানজিস্টার ছাড়তেই, আশ্চর্য্য, হেমন্তের সেই গানটাই বেজে উঠলো। মেয়েটা এতই অবাক যে, দীর্ঘ্যকাল ব্যাপারটা ভুলতে পারেনি সে।
আমি ঘটনাটা শুনে একটা দীর্ঘ্যশ্বাস ফেলেছিলাম। সে কি হারিয়েছিল তা সে জানত না।

আমি কতদূর বিষন্ন ও হতাশ হয়েছি তা ঠিক বুঝতে পারছি না। তবে বুকে মাঝে মাঝে একটা পেরেক ঠোকার যন্ত্রনা হচ্ছে। আমার চারিদিকের পৃথিবীটা ছাইবর্ণ। আমার শহরে বৃষ্টি আসে, ভিজে যাই। একচাপ সাদা অবয়বহীন কুয়াশা গড়িয়ে নেমে আসছে। শরীরের ভেতরকার প্রতিরোধ কমে যাচ্ছে। টের পাই সর্দি আর ভিটামিনের লড়াইতে ভিটামিনের জোর মার খাচ্ছে সর্দির হাতে।
হায়, আমি ভিজলে শুধু আমিই ভিজি,
তুমি ভিজলে পুরো শহর ভিজে যায়।। 
আপাদমস্তক কুয়াশায় ডুবে গিয়ে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ি। চারিদিকে বৃষ্টির ফোঁটারা হেঁটে চলেছে। সেই শব্দে একটু উন্মুখ হয়ে উঠি। জোর বৃষ্টিতে যদি রাস্তায় ধ্বস নেমে রেলগারিটা আটকে যায়। বুকের ভেতরটায় দপ করে আলো জ্বলে ওঠে, সঙ্গে সঙ্গে ভিটামিনেরা দ্বিগুন উৎসাহে আক্রমন করে সর্দির ভাইরাসকে। সর্দি পিছু হঠে যায়। পরমুহুর্তেই ভাবি কী লাভ! কি লাভ? ভাবতে ভাবতেই বুকের ভেতরকার আগুনটা নিভে যায়। ভিটামিনেরা মাথা নিচু করে সরে আসে। সর্দির ভাইরাস লুঠেরার মতো শরীর দখল করতে থাকে। আমি ভিজতে থাকি...

শৈশবের মতোই, বিকেলের গন্ধে গন্ধে- সন্ধ্যা নামে।সূর্য্যটা রং হারাতে হারাতে,তোমার টিপের মতোই- কমলা-গোলাপীতারপর ডুব, ছাই আকাশের গায়!
পাটখড়ির গন্ধ, আগুনের সাথে তার কথা বলাবলি-গরম ভাঁপা-পুলি,মুখ বেয়ে নামা গুড়ের স্বাদ,সুদূর শৈশব! 
এ' নগরীতে বিকেলের গন্ধে আজো সন্ধ্যা নামে,নীড়ে ফেরে দুষ্টু শালিক,ভুবন চিল ঘুরে ঘুরে নামে ঋজু গাছটাতে,ফেরে না শৈশব!প্রতীক্ষাতে তুমি নেই,পলিথিন-পুলি হারিয়েছে আবেদন,অথবা বদলেছে স্বাদ বয়সের সাথে- আমার একার!
জনারন্যে একা হেঁটে যাওয়া- প্রতীক্ষাতে তুমি নেই!মাঝরাতে এ'পাশ-ওপাশ, ছেঁড়া ঘুম, নগরী ঘুমায়!কেউ এসে দেয় নাতো টেনে- ফেলে দেয়া কাঁথা, তুমি নেই!
শৈশবের মতোই, বিকেলের গন্ধে গন্ধে-টুপ করে নামে পৌষের সাঁঝ, এ শহরেও!শুধু প্রতীক্ষাতে উদ্বিগ্ন তুমি নেই।তুমি নেই-কতোদিন হয় না বকা খাওয়া,কতোদিন বই নিয়ে হয় না কথা বলা।

দরজা থেকে বিছানায় আসার পথে ভাবি,কেউ কি জানে আমি প্রায়ই এভাবেই খুব একলা হয়ে যাই মাঝেমাঝে মধ্য দুপুরে, মাঝেমাঝে মাঝরাতে । ঝিরঝির দখিনা বাতাস বয়ে যায় আমলকী বনে।কোনদিন কোন বৈশাখী দুপুরে আমাদের দেখা হয়নাই; তোমার চুলের ভাঁজে লুকিয়ে থাকে হারানো সময়। আমাদের দেখা হবে একদিন, সোনালী দুপুর! এসো একটি বসন্ত কাটাই পাশাপাশি ; আরো একটি বসন্ত না হয় আসুক কিছুটা ধীরে,  আমরা চোখে চোখ রেখে অপেক্ষা করবো; হিমালয় থেকে হিমালয়ের শীত বুকে নিয়ে  আসুক না উড়ে পুঞ্জ পুঞ্জ বিবর্ন বাতাস!  ঝরা পাতার মতন মৃত্যুর হলুদ রঙ গায়ে মেখে  আমরাও গা ভাসাবো অতল স্পর্শী কোন বাতাসী সমুদ্রে। পৃথিবীর অন্য কোন পাড়ে 
ফেরারী বসন্তের সাথে উড়ে উড়ে  নবজাতক কোন সুঘ্রান ফুলের বৃন্তে অথবা গাছের ডালে মুখোমুখি কচি দুটি পাতা  চোখে চোখ রেখে বলছে- এসো একটি গাড় বসন্ত কাটাই পাশাপাশি ; আরো একটি বসন্ত না হয় আসুক কিছুটা ধীরে।  আমি পুনর্জন্মের গান শুনি পাখিদের মুখে মুখে  তারা বলে “আবার দেখা হবে বন্ধু প্রিয় বসন্ত সুখে”। 

0 comments:

Post a Comment