পথের মোড়ে মোড়ে ঝুলে থাকা গল্প




সেই যে নদীটা –
যার বুকের থেকে দেখা যায়,
পথে পথে মায়া ছড়ানো।
তার সাথে দেখা হলে ফের, জেনে নিও –
তার জলের কোন ঘুর্নিতে দুঃখ লুকানো।


আবার একটা বৃষ্টির প্রত্যাশায় বুক বেঁধে আছি। তোমার আমার অনাকাঙ্খিত প্রেম ভাসিয়ে নিয়ে যাবো ময়ূরাক্ষীর জলে। আমাদের প্রেমের তো কোনো শাখা ছিল না। তারপরও তোমার সাম্রাজ্যবাদী মন শাখা খুলেছিল কৃষ্ণনগর থেকে বাগনান; পসরা সাজিয়ে বসেছিল ভালো দামে বিকোবার আশায়...
কিন্তু একটা বৃষ্টি বদলে দিল সব। তোলপাড় তুললো... ঘুম ভেঙ্গে জেগে উঠলো সবাই এবার; তোমার আমার পার্সেন্টেজের হিসেব ভাগ করে নেওয়া এক চিলতে খোলা আকাশ সাক্ষী থাকবে মৃত অথবা অর্ধমৃত পাপবোধ গুলোর আটলান্টিস পাড়ি দেওয়ার।

শুধু অপেক্ষায় আছি কোনো ন্যাচারাল ডিজাস্টার আবার বছর ঘুরে এক করে দেবে বিচ্ছিন্ন দুই ব-দ্বীপের গল্প, আর কিছুই ভাবছিনা তেমন। টাকা আবার সত্তর থেকে চল্লিশের ঘরে আসবে কি না, তিস্তার জল ভাগের মা পাবে কি না, আর কত সি.আর.পি.এফ জওয়ান রক্তাক্ত হবে আর ভাবিনা এসব কথা।
উবু দশ কুড়ি বলতে বলতে কেটে যাচ্ছে অষ্টাদশীর চু কিত কিত এর বিকেল। সেখানে দিন বদলের ধুসরতা এখনও ছেলেবেলাকে গ্রাস করে না। এদিকে সন্ধ্যার স্তব্ধতাকে ঘিরে কেনি জি'র স্যাক্সোফোন ভাঙ্গতে থাকে শহুরে স্কাইলানের স্তব্ধতায় মোড়া যৌবন। ঠিকানা হারিয়ে অলিপাব এ খুঁজি বন্ধুত্বের ঘ্রাণ। সেখানে প্রাপ্তির ঝুলিতে একটিও আপেল পড়ে থাকে না। আলিশান মেহেফিল শুধু দেখিয়ে দেয় শীতঘুমের রাস্তা। এবার তবে অক্ষরে শুধুই বানপ্রস্থ লেখা হোক।

নীরবতার খুব কাছে গিয়ে প্রশ্ন করি;
ভিতরে এত তোলপাড় কীসের তোমার ?
কখনও ভালবেসেছিলে কাউকে ?
অথবা  বিষাদ
হয়ে দরজা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিলো কেউ ?
তুমি যাকে আকাশ ভেবে দিগন্তরেখায়  মিশিয়েছিলে?
সেটা আসলে পাহাড় ছিলও ; দৃঢ় চিবুকে অশ্রু- বেদনহীন।
কিংবা  বলতে পার মরুর মাঝে একটি সবুজ পাতা ;
ভাবতে শেখায় মৃত্যু ছাড়া জীবন ভারী বোকা!
ভাবতে পারো মৃত্যুর সাথে জীবন শুরু করা,
ভাবতে পারো ভালবাসলেও কিন্তু
তুমি একাই…!!
আর যদি না ভাবতে পারো,
তবে নীরবতা কে প্রশ্ন করো – কীসের
নীরবতা ?

হঠাৎ একটা ছবি মনে পড়ল, আঁকতে আঁকতে কারা যেন উঠে গেছে কুহু ডাকে। আর সেই পাখিরা- নগ্ন মেঘেরা- দাঁড়িয়ে আছে একঠায় বেসামাল বিটপের ঠোঁটে। মাঝে মাঝে ভুলে যাই পৃথিবীর জ্যামিতি, মাঝে মাঝে ভুলে যাই ফিরে আসা। লবঙ্গীর বনে নড়ে ওঠে আরও একটা পোড়ানো নিলয়।

ট্রেন চলে গেলে শূণ্যতা পড়ে থাকে পিছনে পিছনে; শহরটা মরে যায় একদিন। ধূলি জমে থাকে এখানে ওখানে, কোনো ট্রেন ভিড় করে না আর ধূলি জমা স্টেশনে। শূন্যতা বিষয়ক একটি গল্পের মধ্যে কত যে প্রশ্ন...। উত্তরপর্বে এসে বোকার মতো মাথার উপর খোলা আকাশ নিয়ে হাঁটি বহুদূর- তবুও কি খুঁজে পাই তৃষা মেটাবার মত...।  বুকের মধ্যে অচিন পাখি এক করুণ স্বর, কাঁদে নিভৃতে। পূর্ণতার কাছে পরিত্যক্ত এই অস্তিত্বের খড়িমাটি!
পথের মোড়ে মোড়ে ঝুলে থাকে অনেক প্রশ্ন- অনেক উত্তর নতমুখ হেঁটে যায়- রঙিন হাসে। এইসব দেখে দেখে শূন্যতা বিষয়ক গল্পটা ক্রমশ বড় হয়- অনেক প্রশ্নের উত্তর তবুও অজ্ঞাত। শুধু চলতে চলতে হঠাৎ সরু পথ- ঘোলাটে দৃষ্টি।

আসবে যত পাতার কথাও -
কে কখন চেয়েছিলো শীতের কবিতা -  বলেছিলো - কথা দাও-
আজও সে কথামালা আছে তোলা  অবাক খাতার 'পরে - আজ আবার
হয়তো হবে খোলা।
হয়তো হবেনা - আহা - না ঝর্ণা - না বর্ষাবেলা -
পদচিহ্নময় বাংলার রূপোলি খেলা -
খেলা ফেলে চলে যাওয়ার নৌকো জীবনে ফেরেনা।
নোঙরের দাগ পড়ে রয় ঘাটে - তবু সে অচেনা।
দেখি - ঝকঝকে সব মুখ - চকচকে স্নানঘর -
অর্ধচেনা - অর্ধজানা - আশপাশের নতুন  কলস্বর।
ওই মুখ, ওই ঘরদোর আমাদেরই পাড়ায় ছিলো -
আগে তা তেমন করে নজর পড়েনি - আজ হঠাৎ পড়লো।
এইমাত্র রাস্তায় দেখা নতুন মুখকে মনে করে -
হয়তো কবিতা হবে - কিংবা গল্প।
পাতারা রাখবে ধরে।
ওই তো সূর্যাস্ত দেখে পাখিরাও ঝাঁক  বেঁধে নীড়ে ফেরে।
কাল আবারও  দেখা হবে যথারীতি সূর্যওঠা ঘিরে।

ভাল আছি- ভাল না থাকলে কি আর আড্ডায় আড্ডায় রাজা-উজির মেরে বেড়াই কিংবা তাড়িয়ে বেড়াই বনের মোষ? এই কথা শুনেই তুমি তো হোঃ হোঃ হেসেই খালাস! কাল যেমন হঠাৎ দেখা বন্ধুটিও তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে...। আশ্রমে যাবার কথা  শুনলে কি হাসতে হয় ? কেউ কি জানে কার বুকে কার আশ্রম!  উড়তে উড়তে কত যে পালক খুল গেল- কত স্বপ্ন যে দুঃস্বপ্নের অতলে তলিয়ে গেল- সে মনে রাখেনি তার একটি অর অথবা বর্ণও! সে শুধু জানে একদিন তাকে ছুঁয়ে দেখতে দূরের আকাশ। তাই সে রোদে পোড়ে- বৃষ্টিতে ভেজে...
একদিন সে সত্যি সত্যিই আকাশ ছুঁয়েছিল- নীলিমার চোখে চোখ রেখে, ঠোটে...। সেদিন তার মৃত্যু  হয়েছিল!
তোর অজস্র বসন্ত বিকেল থেকে, শুধু একটা বিকেলে আমাকে ধার দিস। ডানা ভাঙ্গা পাখির দল তোর  আর আমার হারিয়ে যাওয়ার সাক্ষী !  আমি তো হারিয়ে যাবো ঠিক ই, অজানা অহংকারে ,
মিছে দাম্ভিকতায় আর  অর্থহীন জেদে !  ডানাভাঙ্গা পাখিরা ঠিক ই মনে রাখবে !
আমি একটা বিষন্ন রাতের গল্প , যার  তারাগুলো বিষাদের  সুরে কাতর ! বাতাসে গভীর শুন্যতার ছায়া !
আমি লিখতে বসেছি অতৃপ্ত  আত্মার গল্প সঙ্গী আঁধার আর মন খারাপ করা রাত !!

বসন্তের স্নিগ্ধ বিকেলের হাওয়ায় সবুজের আলোড়ন , যান্ত্রিক অবয়বে তোর আগমনে প্রকৃতিতে উচ্ছ্বাস ছিলনা ! আমার নিস্তব্ধ  সাঝবেলায় তখনো হাওয়ার  ছাট লাগেনি !  ধীরে ধীরে মনোজগতে তোর অদৃশ্য দখলদারি ! আমার পাখিদের সুর তুই বুঝিস , আমার  বিকেলের রোদ তোর হয়ে যায় ,
আমার নদীর বাকে তোর ছোট্ট  কুটিরে জোছনা বিলাসের  সমস্ত অধিকার তোর ই কেবল !
তারপর একদিন তোর চোখে আমি অপ্সরী ছায়া দেখতে পাই !

"And There will be
companions with beautiful ,
big , And Lustrous eyes " !

আমার নদীর জল , আমার বিকেলের হাওয়া , আমার পাখিদের গান তোকে উপহার দিই রোজ !বিনিময়ে পাই তোর  আকাশের মেঘের ছায়া , তোর স্নিগ্ধ সকাল !
তারপর একদিন ঝুম  বৃষ্টি নামলো আমার জানালার টুকরো আকাশ থেকে ! দু ফোটা বৃষ্টি জল আমায়
ছুঁয়ে গেল ! তোর  আকাশে তখনো কালো মেঘ !  বিষন্ন আকাশের হুংকার ! পাখিদের ওড়াওড়ি নেই ,  আমি জানিনা তোর আকাশ  কি এখনো থমকে আছে বিষন্নতায় ??  আমার জানালার কান্না বন্ধ
হলে আমি তাকাই তোর আকাশে ! কিন্তু হায় আমি দেখতে পাইনা তোর আকাশ , তোর স্নিগ্ধ সকালের  মায়াবী রোদ ! আমার নদীর বাঁকে  কুড়েঘরে জমে থাকা অভিমান ! নদীতীরে বসা একটা নিঃসঙ্গ  চিলকে পাঠাই তোর খবর  আনতে , সে চিল আর  ফিরে আসেনা ! আরো চাপা অভিমান
বুকে বাসা বাধে ! তারপর এক  সাঝ বেলায় মৃত্যু এসে ভর  করে আমার ঘুমে ! নিরস  দেহটা পড়ে থাকে , মৃত্যূ হয় অভিমানী আত্মার।  

আমি দেখতে পাই আমার মুঠোফোনে তোর অজস্র ডাক , দেখতে পাই মুঠোফোনে তোর পাঠানো কথা মালার আগমন ! আমি যে স্পর্শ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি , আমি সে কথামালা জানতে পারিনা ,  পারিনা জানিয়ে দিতে আমার  অভিমানী আবেগ ! খুব  জানতে ইচ্ছে করে কি হয়েছিল
তোর , খুব জানিয়ে দিতে ইচ্ছে করে অভিমানী মেঘের  যে মরণ হয়েছে! একটা চিল উড়ে যায় তোর বাড়ির দিকে , আমি তাকে বলে দেই আমার আকাশ হয়ে যাবার খবর !

যে সব মেঘ রাস্তায় দাড়িয়ে বরফ  বিক্রি করে
তাদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা নিয়ে
তোমার চুলের সঠিক বিন্যাসের ব্যাপারে
থেকেছি প্রচার বিমুখ।
সবচেয়ে অভিজাত স্পর্শগুলো হ্যাংগারে
ঝুলিয়ে বুঝলাম তোমার দাঁড়াবার ভঙ্গি
আবিষ্কারের ফলে আমার কোন উপকারই
হয়নি।

আকাশটা তখন অদ্ভুত ছাই রঙের। শীতকালেএমন মেঘলা আকাশ সচরাচর দেখা যায় না।
প্রচন্ড ঠান্ডা বাতাস বয়ে যাচ্ছে মাঝে মধ্যেই। যে পথে এসেছিলাম সে পথেই আবার হাটতে শুরু
করলাম। এই গাছগুলি সবাই আমার পরিচিত, এই রাস্তার  পিচটাও কত পরিচিত। তবু আজ যেন কত
অচেনা লাগলো। আস্তে আস্তে ইলশেগুড়ি বৃষ্টি শুরু হল,
চারপাশে সবাই দৌড়ে ছায়াতে চলে গেল,  কেউবা ছাতা বের করলো। চারপাশটা কি নিশ্চুপ আর বিষন্ন। আমি ধীরে ধীরে হাটতে থাকলাম।  ক্যাম্পাসের পেছনের গেট দিয়ে বের
হয়ে হাটতে হাটতে কখন যে কলেজ স্ট্রিটের মোড়টাতে এসে দাঁড়িয়েছি, নিজেও খেয়াল
করিনি। আমার সামনে কফিহাউসের দিকে চলে যাওয়া রাস্তাটা। বৃষ্টি তখন বেশ
জোরেই পড়ছে।
পথ... শুধুই কি পথ ? পথের সাথে জড়িয়ে থাকে পথিকের স্মৃতি। পথ কি খেয়াল রাখে, তার বুকে হেটে যাওয়া পথিকের কথা ? তাদের অভিমান অনুভূতির কথা ? এই রাস্তায় কত মানুষ হেটে গিয়েছে, তাদের আনন্দ অভিমান কষ্টগুলিকে সাথে নিয়ে, এই রাস্তা কি তা মনে রেখেছে ? অনেক কিছু ভাবতে ভাবতে আমি হাটতে থাকলাম প্রিয়তম  এই পথে। চারপাশটা এত নির্জন। বিচ্ছিন্নভাবে এক দুটো ঠেলাগাড়ি ছাড়া কিছুই  চলছে না। বৃষ্টি পড়ছে অঝোর ধারায়, ভিজে যাচ্ছি আমি, ধুয়ে যাচ্ছে আমার ভেতরটা।  থেকে থেকেই দমকা হাড় কাপানো হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। এমনিতে আমি ভয়াবহ শীতকাতুরে, কিন্তু  কি আশ্চর্য ব্যাপার আমার একটুও কষ্ট হচ্ছে না। আমি খুঁজতে থাকলাম সেই শঙ্খচিলগুলিকে যাদেরকে আমি চিনেছিলাম কোন এক ঘোর লাগা সন্ধ্যায়। কি আশ্চর্য !  আজ তারা কোথাও নেই। একই  পথে আমি হেটে যাচ্ছি একা, সঙ্গে বিষন্ন  মেঘগুলি আর ঝরে পড়া জলের বিন্দুগুলি।
রেমিনিসেন্ট। হ্যা, ধার করা শব্দ, ধার করা অনুভূতি।পৃথিবীতে আরো অনেক ঋণের মত হয়ত এই ঋণটাও আমি শোধ  করতে পারবো না কোনদিন, হয়ত যিনি ধার
দিয়েছেন তিনি জানবেনও না, তারই
অগোচরে তার অনুভূতিকে ব্যাবহার  করেছি আমি।
এক আশ্চর্য  কারনে বৃষ্টির  স্পর্শেও রেমিনিসেন্ট শব্দটাই  আমাকে আবার আঘাত করলো। কতদিন এই  বৃষ্টির স্পর্শ পাইনি আমি। এই স্পর্শ যেন  আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে কত একাকীত্বের কথা।
হাটতে হাটতে কখন যে বাড়ির কাছে  চলে এসেছি নিজেও খেয়াল করিনি।
তখনও অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে, আর আমার মাথার  মধ্যে বেজে অঞ্জন দত্তের গানের কিছু লাইনঃ

"থাকবে না রাস্তায় গাড়ি ঘোড়া, দোকান পাট
সব বন্ধ
শুধু তোমার আমার হৃদয়ে
ভিজে মাটির সোঁদা গন্ধ"

অনেকদিন পর খেয়াল করলাম  আমার চোখ আবার ঝাপসা হয়ে গিয়েছে, বৃষ্টির জলেই সম্ভবত।

তোমায় বুঝতে সেদিন চায়ের কাপে ঝড় তুলেছিলাম,
একদিন পাতার ভাষা শিখতে হাওয়ার দ্বারস্থ হয়েছিলাম, গুমোট পরিবেশটা বলছিল সেদিন হাওয়াটাও হাওয়া হয়ে গেছে।
আসলে না বলা কথা বোঝার অনেক সন্ধিক্ষন আছে।শুধু ছায়াটাও বলতে পারে কাছে থাকার অনুভুতি।
প্রলাপের পেছনের আলাপটা বোঝার জন্য আজ আবার গাছের নীচে এসে দাঁড়ালাম।
এইমাত্র মৃদু হাওয়া বইতে শুরু করলো...
রাতের অন্ধকারেও নাকি লুকিয়ে থাকে কিছু গল্প।  আমি তাই চোখ মেলে অন্ধকারের  উপস্থিতি মেপে অপেক্ষায় আছি। দাও, তোমার  গল্পের কিছু প্রান, তা দিয়েই  আমি রচনা করবো অসহায়
আত্নসমপর্ণে হারিয়ে যাওয়া কোন গানের শেষ  দু'লাইন। একদিন এক ইউক্যালিপ্টাস
গাছ এর  গল্প বলেছিলাম তোমাকে।  জোছোনার সমুদ্রে ভিজে দীর্ঘ এক  রাত্রিতে  আরো কত কথাই
তো বলেছিলাম।
ঝিকিমিকি,তপোবন, মালাকাইটের  ঝাঁপি,ইস্পাত, মা,অন্ধ সুরকার এর মত প্রিয় বইরাও ছিলো আমাদের  গল্পে।  ছিলো জোনাকি।  ছিলো প্রথম ভালোবাসা। প্রথম দুঃখ ; প্রথম চুমুর গল্প। সেই তুমিটাও কোথায় যেনো হারিয়ে গেছো। যখন হাত বাড়ালেই তোমার উত্তাপে ভেজবার কথা।
যখন চোখ মেললেই তুমিময় আলো।
নাহ অনেকদিন হয়ে গেলো; গল্পবলা রাত আর আসেনা।  প্রিয় বই, প্রিয় পাখি,  প্রিয় গাছ এর গল্পবলা আর হয়না আমার। এখন আমার দীর্ঘরাত  জুড়ে দেয়ালের সাদা।  বালিশটাকে উল্টেপাল্টে  দেই বহুবার। যদি স্বপ্ন বেয়ে আসো কোনদিন।  আমি তোমাকে ছুঁয়ে দেখবো। তোমার চোখের তারায় এখনো কি এক  কাঠবিড়ালী উচ্ছল হয়?  তোমার বুকের  কাছে দাঁড়িয়ে  এখনো কি পাড়ি দেয়া যায়
অনেক শহর ?

হলুদ পাতা আর বরফ  ছুঁয়ে দিতে একবার ও কি আসবেনা তুমি? আমার ঘরের দেয়ালে ঝুলানো আয়নাতে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দুজনে  আবার কখনো কি ভালোবাসা হবে? হবে কি পৃথিবীর এ  যাবতকালের  সবচেয়ে দীর্ঘ এক আলিঙ্গন?

তুমি এখন আর স্বপ্ন বানাও না,
এখন আমিও আর স্বপ্ন দেখি না,
এখন আর তুমি বৃষ্টিতে ভিজো না,
সব সময়কার মত বৃষ্টি জলে শুদ্ধ
হতে আমি চাইনা অনেকদিন…
তুমি সন্ধ্যা ঘনালে লালচে আকাশে মেলাও,
আমি একটা দুটা তারা গুনে গুনে ক্লান্ত হই…
আমি বারান্দার ঝুলন্ত দোলনায় দুলতে দুলতে
এক সময় ঘুমিয়ে পড়ি।
তোমার গড়া স্বপ্নগুলো আমার চোখে হাত
বুলায় না তখন,
রাতের
আঁধারে চুপি চুপি স্বপ্নগুলো ডানা মেলে না।
উড়ে উড়ে আমার আকাশে রঙ ছড়ায় না।
কাকডাকা সকালে তুমি ব্যস্ত  পায়ে হেঁটে হেঁটে যাও
একটু খানি আকাশ দেখার তোমার হয়না অবসর,
আমি সেই আকাশের ছোট্ট প্রজাপতি হই না।
তবুও তুমি জানো, আমি জানি-আমাদের
স্বপ্নগুলো এক…
আমার বুক পকেটে এক অচল স্বপ্ন ঘুমায়,
তোমার শাড়ির আচলে বাঁধা থাকে সেই একি ঘুমন্ত  স্বপ্ন…


সিঁড়িভাঙা অঙ্কের মতো যখন নেমে আসে সন্ধে, আমি সেই ভেজানো জ়ানালার ফাঁক দিয়ে দেখি কি নিবিড়ভাবে তুই ভূগোলের পাহাড় নদী পার হয়ে এসে পড়েছিস রুপসার ঘোলা জলে ...
তারপর এক সময় নূরজাহান হয়ে  নিজেই মিশে যাচ্ছিস পাঠ্যবইয়ের ইতিহাসে ...কখনও আবার রসায়নের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে হয়ে যাচ্ছিস  টেস্টটিউবের লঘু সালফিউরিক আ্যাসিড; আর দূরে তখন আমি কোনও এক ল্যাবে সাতশো বছর ধরে পড়ে থাকা কপার কেঁপে কেঁপে উঠছি তোর স্পর্শের অপেক্ষায় ..
মরচে ধরা জানলার  পাল্লা খুলতেই  কিছু খুচরো পাপ  ছড়িয়ে পড়ে মেঝেতে, আর মুখের আনাচে কানাচে গুঁড়ো গুঁড়ো অনুভব দমকা হাওয়ার;  হ্যাঙ্গারে রাখা জামা দোল খায় ঘর জুড়ে আপন  খেয়ালে।  আর বারান্দার  কার্নিশে ডানা ঝাপটায়  বুড়ো ডাক। নি:সঙ্গ দুপুর জুড়ে তোমার
না আসা চিঠি, লিখে চলি অকারণ হলদে পাতা জুড়ে আর মনের প্রান্তে ক্যানভাসে কেউ এঁকে চলে রং-তুলি। হঠাৎ একটা চড়ুই জানলা খোলা পেয়ে ঢুকে পড়তে চায়, শুকনো পাতার ঝরে পড়ায় আর কড়ি বরগার ফাঁকে আটকে থাকা ভাঙা ঘুলঘুলি, পাঁচিলের ওপাশে আটকে পড়া রোদের ছায়া বাঁক ফিরে আধা বন্ধ হওয়া চায়ের দোকান  আর আচমকা হাঁক দিয়ে যায়  কোনো ফেরিওয়ালা,…

কুড়িয়ে বাড়িয়ে যেটুকু পড়ে থাকে নীল-তাকে কিংবা চৌকাঠ ভেঙ্গে পেরিয়ে যাওয়া সদর দরজায় আর গলির মোড়ে আসে না সেই অচেনা বাঁশিওয়ালা… কিছু খুচরো পাপ গড়িয়ে পড়ে হাতের নাগাল না পেয়েও!

একদিন পালিয়ে যাবো। শহরের কড়া রোদ থেকে,
অবিরত শোরগোল, বন্ধ ঘরের গুমট গন্ধ থেকে,

পালিয়ে যাবো বালুময় বাতাস থেকে, শ্যাওলা পড়া ইটের দেয়াল, সে দেয়ালে নিয়ত
আছড়ে পড়া প্রতিধ্বনি থেকে।
সে প্রতিধ্বনিতে মানুষের হাহাকার মিশে থাকে।
আফসোস এর নিঃশ্বাসে ভারি হয়ে থাকে এ বাতাস। তোর আমার
হতাশার গল্প শুনতে শুনতে একদিন এ দেয়াল
ধসে পড়ে আমাদের উপর।

পালিয়ে যাবো দুঃস্বপ্ন দেখানো অন্ধকার থেকে,
সন্ধ্যাতারা লুকিয়ে রাখা কালো মেঘ,
অসীম আকাশের গায়ে কাটা দাগের মতো
লেপ্টে থাকা বিদ্যুতের তার থেকে, খোলা রাস্তায়
মানুষের ভীড় থেকে, ধুলো জমা ধুসর- সবুজ পাতা থেকে।
বিরান পথে নেমে যাবো, যে পথে পেছন থেকে
রিকশার ভেপু তাড়া করে বেড়াবে না, পাতায় ময়লা জমে নাযেখানে নিরন্তর বাতাসে- সে পথের
সাথে বন্ধুতা করে নেব।

একদিন হঠাৎ করেই দেখবি তোর বন্ধুতা, ওর ভালোবাসা ছিড়ে টুকরো করে নিরুদ্দেশ হয়ে যাবো। কত গল্প বাকি থাকতেই আসর ভেঙ্গে উঠে চলে আসবো।
হয়তো পথ চলতে চলতে ধরে থাকা হাতের বাধন আলগা করে নেব, শত স্পর্শ কামনার সুখ
পায়ে ঠেলে বিজনগামী হব।

কেউ কাঁদবে , কেউ ভাববে, কেউ বা
বড়ো করে নিশ্বাস ফেলবে ...হয়তো অস্বস্তির, হয়তো স্বস্তির।।।কিন্তু তবু
তোর গান শোনার জন্য কান পেতে থাকবো না, অন্যের বাঁশীর শব্দে বিমোহীত হব না,
পালিয়ে যাবো অনেক অনেক দূরে। এই শহর, শহরের
শ্যাওলা পড়া দেয়ালের মোহ  কাটিয়ে অন্য কোথাও, নিজেকে খুজে নেবো। একটু
জায়গা খুজে নেব খোলা মাঠে বা পাহাড়ের চুড়োয় কিংবা ভীষণ একা কোন রাস্তার ধারে-
যেখানে কড়া রোদ নেই তাই তেষ্টায় বুক ফাটার গল্প নেই, মানুষের ভীড় নেই-
আছে এলোমেলো পায়ে হেটে বেড়ানোর স্বাধীনতা।
আছে স্তব্ধতা- শুনতে পাবো ভেতরের ডাক, বুঝবো বেঁচে আছি।
স্বচ্ছ আকাশের হাজারো তারার মেলা দেখবো, গলায় আটকে  বসা গান
গুলো ডানা মেলবে
বাতাসে- অবচেতনে। নির্বাক ঘাস্ কে গল্প শোনাবো
রাত-ভর; আমার গল্প। সব বলে নিঃস্ব হয়ে যাবো।
নিঃস্ব হতেই একদিন নিরুদ্দেশ
হয়ে যাবো।


0 comments:

Post a Comment